এডভোকেটশিপ পরীক্ষার প্রস্তুতি - পর্ব ১ BDLAW ASK

এডভোকেটশিপ পরীক্ষার প্রস্তুতি - পর্ব ১

এডভোকেটশিপ বা বার কাউন্সিল পরীক্ষার প্রস্তুতি:

এ পরীক্ষা বাংলাদেশ বার কাউন্সিল কতৃক ঢাকায় অনুষ্ঠিতহয়। বার কাউন্সিল পরীক্ষা উত্তীর্ণের মাধ্যমেএডভোকেটশিপ সনদ প্রদান করা হয়। এ সনদের বলে আইনজীবী হিসেবে আদালতে আইন প্র্যাকটিস করার অনুমতি দেয়া হয়। এডভোকেটশিপ সনদ ধারীদের বাংলাদেশে এডভোকেট বলে। যেকোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৪ বছরের অনার্স অথবা ল কলেজ থেকে ২ বছরের ল কোর্স শেষ করে থাকেন তাহলেই আপনি এডভোকেটশিপ পরীক্ষা দেওয়ার যোগ্যতা রাখেন। এজন্য আপনাকে যে আদালতে আপনি প্র্যাকটিস শুরু করতে চাচ্ছেন সে আদালত থেকে বার কাউন্সিল বরাবর ইন্টিমেশন জমা দিবেন। ইন্টিমেশন জমা দেওয়ার ৬ মাস পর সেকেন্ড ইন্টিমেশন জমা দিতে হয়। এভাবে পরীক্ষার জন্য রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম শেষ হলে পরীক্ষার্থীদের এডমিট কার্ড দেয়া হয়। এডমিট কার্ড পেলে আপনি পরীক্ষা দিতে পারবেন যদি বার কাউন্সিল এডভোকেটশিপ পরীক্ষার জন্য সার্কুলার প্রকাশ করে। ইন্টিমেশন জমা দিতে ৪-৫ হাজার মতো খরচ হয়। 

ভাবছেন হয়তো এবার সিরিয়াসলি এডভোকেটশিপ পরীক্ষা দিবেন তাহলে আপনি ঠিক জায়গায় এসে পৌঁছেছেন। এখানে আপনার জন্যে আছে এডভোকেটশিপ পরীক্ষার প্রস্তুতি সংক্রান্ত ধারাবাহিক পর্ব। 

এডভোকেটশিপ পরীক্ষার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হলে দরকার সাধনা, একাগ্রতা ও অধ্যাবসায়। বিসিএস এর মতোই এডভোকেটশিপ পরীক্ষাও তিনধাপে সম্পন্ন হয়: প্রিলি, রিটেন ও ভাইবা। এডভোকেটশিপ পরীক্ষায় সময় সময় বিভিন্ন নিয়ম বা পরিবর্তন আসলেও বর্তমান নিয়ম হলো প্রিলি পরীক্ষায় পাশের একজন পরীক্ষার্থী লিখিত পরীক্ষা দিতে পারবে। লিখিত পরীক্ষায় পাশ করলে ভাইবা দিতে পারবে। একবার ভাইবা ফেইস করলে পরবর্তীতে প্রিলি-রিটেন আর দিতে হয়না। শুধু ভাইবা দিতে পারবে। এভাবে তিন তিনবার ভাইবা ফেল করলে পুনঃ প্রিলি, রিটেন পার করে আসতে হবে। ভাইবা দেওয়ার পর চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হয়। চূড়ান্ত ফলাফলে উত্তীর্ণ হওয়ার পর যে আদালত থেকে প্রথম ইন্টিমেশন জমা দিয়েছিলেন সে আদালতে আইনজীবী হিসেবে নথিভুক্ত হবেন। এজন্য উক্ত আদালতে আরেকটি ছোট্ট ভাইবার মুখোমুখি হতে হয়। তবে এ ভাইবায় তেমন কোন জটিলতা নেই; বলতে পারেন ফর্মালিটি বা পরিচিতি পর্ব। 

ভয় পেয়ে গেছেন? যদি এডভোকেট হতেই হয় তাহলে ভয় পাওয়া আপনার জন্যে শোভনীয় নয়। যথেষ্ট সাহসী বলে আপনি এই পেশায় আসতে চাচ্ছেন। যারা ভীতু প্রকৃতির কোন ছল চাতুরী করে এডভোকেট হয়ে যাবেন তাহলে এ পেশায় না আসাটাই বেটার। যদি কোন মামা খালুর আশ্রয়ে এডভোকেট হবেন তাহলে এ লেখা আপনার জন্য নয়। যারা পরিশ্রমকে পুঁজি করতে পারবেন তারা আরেকবার লুঙ্গিটা খুলে টাইট করে পরে নেন যেন প্রস্তুতিটা জীবনে একবারই নিতে হয়। 

এবার প্রস্তুতির কথায় আসুন। কিভাবে প্রস্তুতি নিবেন? এজন্য কেমন পড়াশুনা দরকার! প্রথমেই বলি; টাকা দিয়ে কন্ট্রাক্ট করে এডভোকেট হওয়া যায় এরকম কথা শুনে থাকলে এরকম কথা সম্পূর্ণ ভুলে যান। এরকম টাকা লেনদেনের প্রথা সাধারণত ২ বছরের ল কোর্সের পরীক্ষার্থীদের মধ্যে আদালত পাড়ায় শুনা যায়। এটাও একধরনের দালাল চক্রের টাকা হাতিয়ে নেয়ার ফন্দি মাত্র। 

এডভোকেটশিপ পরীক্ষার প্রস্তুতি কৌশল: 

আমি যে কৌশলের কথা বলছি তাহলো প্রিলি ও রিটেন একসাথে প্রস্তুতি নেয়া। অর্থাৎ এমনও হতে পারে প্রিলি ও রিটেনের বই আপনি একসাথে কিনে নিয়ে নিলেন। পড়ার সময় আপনি প্রিলিকে বেশি গুরুত্ব দিলেন।  অর্থাৎ যুগপৎ প্রিপারেশন। এতে করে কষ্টের ঘানি অনেকাংশে কমে যায়, আত্মবিশ্বাসও বেড়ে যায়। কারণ হলো প্রিলির জন্য যে সাবজেক্টগুলি পড়তে হয় সেইম সাবজেক্ট গুলিই রিটেনে পড়তে হয়। এই কৌশলের আরেকটি কারণ হলো; অধিকাংশ পরীক্ষার্থী রিটেন থেকে ঝরে যায়; বলতে গেলে সবচে বেশি। কেউ একজন প্রিলির জন্য খুব ভালো প্রিপারেশন নিল যে ১০০ টা MCQ এর মধ্যে ৯৯ পেল কিন্তু রিটেন প্রিপারেশন নিতে গিয়ে তেমন সময় পাইনি যার ফলে রিটেন ফেল করে। তখন তাকে আবার প্রিলি দিতে হবে। যদি যুগপৎ উপায়ে প্রিলি ও রিটেন একসাথে প্রস্তুতি না নেয় এমনও হতে পারে সে বারবার প্রিলি দিয়ে যাচ্ছে, পাশও করছে কিন্তু রিটেন আর পার করতে পারেনা। যারা খুব ভালো পড়াশুনা করে এডভোকেটশিপের জন্যে তাদের অনেকেই দেখা যাই প্রিলি দেওয়ার পর রিটেনের সিলেবাস দেখে ঘাবড়ে যাই। যার ফলে প্রিলির জন্য অমানবিক পরিশ্রম করা সত্ত্বেও এডভোকেট হওয়ার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। যুগপৎ প্রিপারেশনের আরেকটি সুবিধা হলো প্রিলি ঠিকলে এক সান্সসেই লিখিত ভাইবায় উত্তীর্ণ হওয়া অর্থাৎ সোনার হরিণ নামক এডভোকেটের তকমা গায়ে দেয়া। এর পাশাপাশি প্রিলির জন্য পড়া অনেক বিষয় রিটেনের সময় কাজে লাগানো যায়। আবার অনেক রিটেনের পড়া প্রিলির জন্য সহায়ক হয়। দু দুবার কষ্ট না করে মোটামুটি একটা ভালো প্রিপারেশন নিলে সময় ও মেমোরি দুটোই সাশ্রয় হবে। তবে অনেকের ভিন্ন ভিন্ন কৌশলও থাকতে পারে। প্রিলি রিটেন একসাথে প্রিপারেশন নেয়ার অর্থ এ নয় যে রিটেনের ড্রাফটিং গুলিও শিখে ফেলতে হবে আসলে প্রিলির সময় থেকে রিটেনের বই গুলি নাড়াচাড়া করলে পরিচিতিটা বাড়ে। এবং প্রিলি ও রিটেনের মধ্যে কমন টপিকগুলি বেশি বেশি জোর দেয়া। রিটেনের প্রস্তুতির সময় ড্রাফটিং সহ অনেক কিছু অতিরিক্ত পড়তে হয় তাই কিছু টপিক যা প্রিলির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আগে পড়ে নেয়া যাতে রিটেনের প্রস্তুতি টা আরেকটু ভালোভাবে ঝালাই করে নেয়া যায় এবং পর্যাপ্ত সময়ও পাওয়া যায়। যুগপৎ প্রিপারেশন নেওয়ার আরেকটা কারণ তাহলো প্রিলির MCQ অনেকের জন্য নতুন হওয়ায় যা না বুঝার কারণে মেমোরি থেকে চলে যায়। তাই মেমোরিতে সাস্টেইন করানোর জন্য টপিকগুলি বিস্তারিত পড়তে হবে বুঝে বুঝে যার জন্য সহায়ক হবে রিটেনের বই গুলি। 

প্রস্তুতির জন্য কেমন সময় লাগবে?

২ বছরের ল কোর্সের পরীক্ষার্থীদের জন্য দৈনিক ৬ ঘন্টা পড়াশুনা করলে ১ বছর পড়াশুনা করা দরকার। সময় টা একটু বেশি বললাম প্রথম প্রিপারেশনটা ভালোভাবে নিতে হবে যা জীবনে একবারই। এরপরের প্রস্তুতি ৬ মাসে নেয়া সম্ভব, এরপর ৩ মাসে, এরপর ১ মাসে, এরপর ১ সপ্তাহেই প্রস্তুতি নেয়া সম্ভব। আমি প্রথমবার পর্যাপ্ত সময় দিয়ে প্রিপারেশন নিয়েছিলাম যে কারণে পরবর্তীতে আমি একদিনেই গোটা সাবজেক্টগুলি রিভিশন দিতে পারতাম। সূতরাং না বুঝে প্রিপারেশন যতই নেন তা কোন কাজে আসবেনা। বুঝে বুঝে যত সময় লাগে দিন এবং এভাবে একবার প্রিপারেশন শেষ করুন। এরপর থেকে যত কম সময় দিয়ে রিভিশন দেয়া যায় সে সময়ে চেষ্টা করবেন। 

এডভোকেটশিপ প্রস্তুতির জন্য যে গাইডবইগুলি কিনতে হবে: 

প্রিলি রিটেন মিলিয়ে মোট চারটি বই কিনতে হবে। ভাইবা সংক্রান্ত কোন বই এখন কেনার দরকার নেই। আসলে ভাইবার জন্য বই না কিনলেও চলে। যদি না ভাইবার সময় প্রিলি রিটেনের পঠিত বিষয়গুলি মাথায় থাকে। প্রিলি রিটেনের সাবজেক্ট থেকে ভাইবার প্রশ্নগুলি করা হয়। তাই প্রিলি রিটেনে পর্যাপ্ত সময় দিন। এজন্য দুজন রাইটারের বই আমি সাজেস্ট করবো। এডভোকেটশিপের উপরে আমার লিখিত বই বাজারে আসার জন্য একটু সময় লাগবে। যে চারটি বই কিনবেন:

১. আইনপাঠ MCQ - রাইটার:  জাহাঙ্গীর আলম

২. নঈমস MCQ - রাইটার: নঈমস 

৩. আইনপাঠ Written - রাইটার: জাহাঙ্গীর আলম

৪. নঈমস Written - রাইটার: নঈমস 

এডভোকেটশিপ MCQ যেখান থেকে আসবে: 

এটা মোটামুটি একটা সিলেবাস বা ধারণা। এডভোকেটশিপ প্রিলির জন্য সময় ১ ঘন্টা, মোট MCQ ১০০টা। 

১. দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮ ----২০

২.ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ ----- ২০

৩. দণ্ডবিধি, ১৮৬০ ---- ২০

৪. সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২

৫. সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ ----১০

৬. তামাদি আইন, ১৯০৮ ---- ১০

৭. পেশাগত আচরণবিধি, নিয়মানুবর্তিতা, বারকাউন্সিল আদেশ, বিধি, বিচারিক সিদ্ধান্ত, প্রতিবেদন ----০৫

উপরের ৭ নং পেশাগত আচরণ বিধি ছাড়া বাকি ৬ টি আইন অনলাইনে পড়া যাবে। তবে আইনগুলি ইংরেজিতে। বাংলা ভার্সনের জন্য বাজার থেকে কিনতে হবে। আমি এ ৬ টি আইনের অনলাইন লিঙ্ক দিচ্ছি। লিঙ্কের উপর ক্লিক করলে আইনটি সহজে পড়তে পারবেন।

 ১. দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮ 

http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-86.html

২.ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ 

http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-75.html

৩. দণ্ডবিধি, ১৮৬০ 

http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-11.html

৪. সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২

http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-24.html

৫. সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ 

http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-36.html

৬. তামাদি আইন, ১৯০৮ 

http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-88.html


এডভোকেটশিপ MCQ পরীক্ষার মডেল টেস্ট পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে যোগাযোগ করুন। পেইজ লিঙ্ক:

https://www.facebook.com/bdlawask

যেকোন আইনি প্রশ্নের সমাধান ইত্যাদির জন্য আমাদের ফেসবুক গ্রূপে জয়েন করতে পারেন। গ্রূপ লিঙ্ক: 

https://www.facebook.com/groups/bdlawask/


লেখক: মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ

এডভোকেট, কক্সবাজার জজ কোর্ট

প্রধান সম্পাদক: bdlawask.com 


© লেখাটি লেখক কতৃক সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

7 মন্তব্যসমূহ

If you have any question, please let me know.