তালাকের বিধান সম্পর্কিত ইসলামী শরীয়া ও বাংলাদেশের আইন BDLAW ASK

তালাকের বিধান সম্পর্কিত ইসলামী শরীয়া ও বাংলাদেশের আইন

তালাকের বিধান সম্পর্কিত ইসলামী শরীয়া ও বাংলাদেশের আইন  

এডভোকেট শহিদ রাসেল


আমি এখানে বাংলাদেশের আইন আর ইসলামের শরীয়তের বিধান সাময্যস্স রেখে তালাক দেয়ার বিধান আলোচনা করব। আমার এখানের আলোচনা বাংলাদেশের আইনের আলোকে বর্ণনা করতে গিয়ে শরীয়তের বিধানের সাথে কিছু মাইনর ক্ষেত্রে অমিল ও হতে পারে। তালাক দেয়ার জন্য দুটি বিষয় অতি গুরুত্বপূর্ণ। একটি হলো তালাকের ঘোষণা আরেকটি হলো ইদ্দতকাল অতিবাহিত হওয়া। কিন্তু বাংলাদেশের আইনে আরো একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো তালাকের নোটিশ প্রেরণ যা অমান্য করলে আইনে শাস্তির ব্যবস্থা আছে। Muslim Family Law Ordinance, 1961 বা MFLO, 1961 বা 
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ সালের ধারা ৭ এ তালাক সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে।

১. মুসলিম স্বামী কতৃক তালাকের ঘোষণা দেয়ার নিয়ম: 


একজন মুসলিম স্বামী তার স্ত্রীকে মৌখিক কিংবা লিখিত তালাক দিতে পারে। মৌখিকভাবে তালাক দেয়ার ক্ষেত্রে মুখে তালাক উচ্চারণ করলে তালাক হয়ে যাবে আবার লিখিতভাবে দিলেও তালাক হয়ে যাবে। স্বামীর মুখে 'আমি তোমাকে তালাক দিলাম' বাক্যটি তালাক দেয়ার জন্য যথেষ্ট। শুধুমাত্র মৌখিকভাবে ঘোষণা দিলেই তালাক হয়ে যাবে। আবার কেউ যদি লিখিতভাবে তালাক দিতে চাই অর্থাৎ মৌখিক উচ্চারণ না করে লিখিতভাবে ঘোষণা দিতে চাই তাহলে যেকোন কাগজে বা পৃষ্ঠায় তালাক দেয়ার ঘোষণা দিলেই তালাক হয়ে যাবে। 

তালাক দেয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোন বাক্য/কলেমা/দোয়া নাই যে তালাক দেয়ার জন্য এই শব্দ কিংবা এই বাক্য উচ্চারণ করতেই হবে। যার যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে মৌখিকভাবে বলে তালাক দিতে পারে। তালাক দেয়ার সময় স্বামী স্ত্রীর নাম, পিতার নাম উচ্চারণ করে তালাক দিলেও হবে আবার স্ত্রীর নাম ধরে তার সম্মুখে আমি তালাক দিলাম বললেও তালাক হয়ে যাবে। অর্থাৎ তালাক মস্কারি কোন জিনিস নয়। তালাক দেয়ার সময় সাক্ষী থাকার প্রয়োজন নেই। বিবাহ পড়ানোর সময় সাক্ষীর প্রয়োজন হলেও, তালাকের সময় সাক্ষী থাকার প্রয়োজন নাই। তালাক দেয়ার জন্য কাজী অফিসে যেতে হবে কিনা অনেকেই প্রশ্ন করে থাকেন। আসলে তালাক দেয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোন স্থান বা সময় নেই। যেকোন জায়গায় যেকোন সময় তালাক দেয়া যায়, এজন্য কাজী অফিসে গিয়ে তালাক দিতে হবে না। কাজী অফিসে বিবাহ রেজিস্ট্রি করা আইনে বাধ্যতামূলক বিধায় বিবাহের সময় কাজী অফিসে গিয়ে বিবাহ রেজিস্ট্রি করতে হয়। কিন্তু কাজী অফিসে তালাক রেজিস্ট্রি করা আইনে বাধ্যতামূলক করা হইনি। তালাক দিলে কাজী অফিসে গিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই। তবে কেউ চাইলে তালাক দেয়ার পর কাজী অফিসে গিয়ে তালাক রেজিস্ট্রি করতে পারবে। সেক্ষত্রে কাজী অবশ্যই নিশ্চিত হবেন যে তালাকটি সত্যি সত্যি সিদ্ধ হয়েছে কিনা পরীক্ষা করবেন। তারপর কাজী তালাকটি রেজিস্ট্রি করতে পারবেন। তবে আইনে কাজী অফিসে তালাক রেজিস্ট্রি বাধ্যতামূলক নয় অর্থাৎ ঐচ্ছিক। কেউ চাইলে তালাক রেজিস্ট্রি করতেও পারে আবার না করলেও কোন অসুবিধা নাই। 

একইভাবে, লিখিতভাবে তালাক দেয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোন ফরম/ফরম্যাট নাই যে এই ফরমে লিখতে হবে। লিখিতভাবে তালাক দিতে চাইলে যেকোন কাগজে লিখে ঘোষণা দিলেই তালাক হয়ে যাবে। এরপরও কিছু কাজী অফিসে তালাকের নির্দিষ্ট ফরম্যাট পাওয়া যায়। এই ফরম্যাট কাজীরাই বানিয়ে নেয় যার কোন আইনি প্রয়োজন নেই বা কোথাও বলা নেই নির্দিষ্ট ফরম্যাটে তালাক দিতে হবে। আইনে কাজী অফিসে বিবাহ রেজিস্ট্রির জন্য কাবিননামার নির্দিষ্ট ফরম্যাট আছে কিন্তু তালাকের নির্দিষ্ট ফরম্যাটের কথা আইনে বলা নাই।
অর্থাৎ মৌখিক কিংবা লিখিতভাবে তালাকের ঘোষণা দিলেই তালাক হয়ে যাবে। ঝগড়ার সময় বা রাগের মাথায় তালাক উচ্চারণ করলেও ভেবেচিন্তে তালাক দেয়ার মতো সমানভাবে গণ্য করা হবে। রাগের মাথায় বুঝিনি, মাথা ঠিক ছিল না এমন অজুহাতের কোন ভিত্তি নেই। 

মৌখিক কিংবা লিখিতভাবে তালাকের ঘোষণা দিলেই তালাক কার্যকর হয়ে যায় না। তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য বড় ফ্যাক্টর হলো ইদ্দতকাল অতিবাহিত হওয়া। ইসলামে ইদ্দতকাল বলতে স্ত্রীর তিন মাসিক/ঋতু/মেইনস্ট্রিমিং/পিরিয়ড সময় পর্যন্ত। বাংলাদেশের আইনে ইদ্দতকাল বলতে নব্বই দিনকে ধার্য করা হয়েছে। তালাক ঘোষণা দেয়ার পর ইদ্দতকাল বা ৯০ দিন অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত তালাক কার্যকর হবেনা। অর্থাৎ তালাক দেয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে কেউ যদি তালাকটি প্রত্যাহার করে নেয় তাহলে তালাকটি রহিত হয়ে যাবে, তালাকটির কোন মূল্য থাকবেনা। তালাক ঘোষণার পর ৯০ দিনের মধ্যে স্বামী স্ত্রী যদি সহবাস করে তাহলে তালাকটি প্রত্যাহার বলে গণ্য হবে। অর্থাৎ কোন স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাক দেয় এবং তালাকের পরবর্তী ৯০ দিন পর্যন্ত স্ত্রীর সাথে সহবাস থেকে বিরত থাকে তাহলে ৯০ দিনের পরদিন থেকে তালাকটি কার্যকর হবে। কেউ একজন তার স্ত্রীকে তালাক দিল আর তালাকের পর স্ত্রীর সাথে পরবর্তী ৯০ মধ্যে সহবাসও করলো তাহলে সে তালাকটি অকার্যকর হিসেবে গণ্য হবে। তালাকের পর স্বামী কিংবা স্ত্রীর ইচ্ছায় বা বিশেষ অনুরোধে যাই হোক না কেন সহবাসে মিলিত হলে তালাকটি বাতিল হয়ে যাবে। একদিকে তালাকের ঘোষণা অন্যদিকে ইদ্দতকালীন সময়ে স্বামী স্ত্রীর সহবাস করা দ্বিমুখিতা এবং অবাস্তব।

২. রাগের মাথায় তালাক দিলে তালাক হবে কিনা।


অনেকে রাগের মাথায় তালাক দিয়েছিলাম বলে যুক্তি তুলে বা অজুহাত দেখায়। বাস্তবে চিন্তা করলে এমন যুক্তি বা অজুহাতের কোন অর্থই নেই। তার কারণ হলো তালাক ঘোষণার পর পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে তালাক প্রত্যাহার কিংবা সহবাসে মিলিত হলে তালাকটি বাতিল হয়ে যাবে। রাগের মাথায় কিংবা ভেবে চিন্তে যেভাবেই তালাক দিক না কেন সে তালাকটি সাথে সাথে কার্যকর হচ্ছেনা কিন্তু তালাকের ঘোষণা হচ্ছে। ঘোষণাটি কার্যকর হবে ঘোষণার তারিখ থেকে ৯০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর। সুতরাং কেউ যদি রাগের মাথায় তালাক দেয় এবং তার ভুল বুঝতে পারে এবং স্বামী-স্ত্রী  সংসার করতে চাই তাহলে তারা সংসার চালিয়ে নিতে বা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে একসাথে আগের মতো থাকতে কোন বাঁধা নেই। এবং তালাকটিও বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। 

তালাকের বিষয়টি একটি উদাহরণের সাহায্যে বুঝানো যায়। ধরুন, কেউ চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা যেতে চাই। তাহলে যাত্রীকে ঢাকার উদ্দেশ্যে গাড়িতে উঠতে হবে। এবং সে যাত্রী সকাল ৭ টাই ঢাকার গাড়িতে উঠল। উঠার পর একটি নির্দিষ্ট সময় পর ঢাকা পৌঁছাল। ধরুন দুপুর ১২ টায় উক্ত যাত্রী ঢাকা পৌঁছাতে সক্ষম হলো। এই উদাহরণটিতে ঢাকার উদ্দেশ্যে গাড়িতে উঠা হলো তালাকের ঘোষণা। গাড়িতে উঠার পর সাথে সাথে যাত্রী কি ঢাকায় পৌঁছে গেল? না। কিছু না কিছু সময় লাগবেই। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হওয়ার পর। এই নির্দিষ্ট সময় হলো ইদ্দতকাল। উক্ত যাত্রী যেমন গাড়িতে উঠলেই ঢাকা পৌঁছে যায়না ঠিক তেমনি কোন স্বামী তালাকের ঘোষণা বা উচ্চারণ করলেই তালাক কার্যকর হয়ে যায় না। তবে হ্যা, ঢাকা যাওয়ার জন্য যেমন চট্টগ্রাম থেকে গাড়িতে উঠতে হবে, তালাক সম্পন্ন হওয়ার জন্যও তালাকের ঘোষণা দিতে হবে। এখন উক্ত যাত্রী ঢাকা যাওয়ার পথে ভাবলো কুমিল্লা নেমে যাবে, সে কিছু একটা ভুল করে ফেলেছে তাই সে কুমিল্লা নেমে গিয়ে ফিরতি গাড়িতে চট্টগ্রাম চলে আসলো। এটি হলো তালাক ঘোষণার পর ৯০ দিনের যেকোন একদিন স্বামী তার দেয়া তালাকটি প্রত্যাহার করে নিল। এবং আগের মতোই ঘর সংসার করতে পারবে। আবার দেখা গেল যাত্রীর বাসটি পথিমধ্যে একসিডেন্ট করলো এবং ঢাকায় পৌঁছাতে না পেরে চট্টগ্রাম ফিরে আসলো। এক্ষেত্রে তালাক ঘোষণার পর ৯০ দিনের যেকোন একদিন স্বামী-স্ত্রী সহবাস করলো তাহলে স্বামীর দেয়া তালাকটি বাতিল হয়ে যাবে। উদাহরণ থেকে এটাই বুঝানো হচ্ছে তালাক দেয়ার পর ইদ্দতকাল একটি সময় যা অবশ্যই অতিবাহিত হতে হবে কোন সহবাস ছাড়া। তাহলেই তালাকটি কার্যকর হবে। 

৩. বাংলাদেশের আইনে তিন তালাকের বিধান: 


বাংলাদেশের আইনে এক তালাক, দুই তালাক কিংবা তিন তালাক অথবা এরচেয়ে বেশি সবার মান একই। যেই লাউ সেই কদু টাইপ। অর্থাৎ এক তালাক দিলেও ৯০ দিন পার হতে হবে, তিন তালাক দিলেও ৯০ দিন পার হতে হবে। বাইন তালাক মানে অপ্রত্যাহার যোগ্য তালাক। বাংলাদেশের আইনে বাইন তালাক বলতে কিছু নাই। অর্থাৎ কেউ যদি স্ত্রীকে বাইন তালাক অথবা তিন তালাক একসাথে দেয় তাও শুধুমাত্র তালাক হিসেবে গণ্য হবে। বাংলাদেশের আইনে তালাক যাই দেন বা যতবারই দেন বা যেভাবেই দেন তালাক দেয়ার পর ৯০ দিন অতিবাহিত হতে হবে কোন ধরণের পুনর্মিলন ছাড়া। তালাক দেয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে স্বামী স্ত্রী যদি তাদের ভুল বুঝতে পারে বা স্বামী স্ত্রীকে ক্ষমা করে দেয় বা তাদের বিরোধের দফারফা হয়ে যায় বা উভয়ের মধ্যে সমঝোতা হয়ে যায় তাহলে কোন বাঁধা কিংবা পুনরায় বিবাহ ছাড়াই পূর্বের বিয়েটি বা সংসার কন্টিনিউ করতে পারবে। যেহেতু তালাক ঘোষণার পর ৯০ দিন অতিবাহিত হয়ে যায় নি। এই ৯০ দিন কিংবা ইদ্দতকাল হল ইসলামে বা আইনে তালাকের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার সুযোগ কাল। 
ইদ্দতকালীন সময়ে বা ৯০ দিন পর্যন্ত স্ত্রী  স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণ পেতে আইনত হকদার। তালাক ঘোষণার পর ইদ্দতকালীন সময় স্ত্রীকে স্বামীর বাসায় থাকতে দেয়া বাঞ্চনীয় এবং শরীয়তও এটি নির্দেশ করে। 

এ সম্পর্কে কোরআনের ঘোষণা.....

‘হে নবী! যদি আপনি স্ত্রীদের তালাক দিতে চান, তাহ’লে ইদ্দত অনুযায়ী তালাক দিন এবং ইদ্দত গণনা করতে থাকুন। আপনি আপনার প্রভু সম্বন্ধে হুঁশিয়ার থাকুন। সাবধান তালাকের পর স্ত্রীদেরকে গৃহ হ’তে বিতাড়িত করবেন না, আর তারাও যেন স্বামীগৃহ ছেড়ে বহির্গত না হয়। অবশ্য তারা যদি খোলাখুলিভাবে ফাহেশা কাজে লিপ্ত হয়, তাহ’লে স্বতন্ত্র কথা। এগুলি আল্লাহকৃত সীমারেখা। যে ব্যক্তি উক্ত সীমারেখা লংঘন করে, সে নিজের উপরে যুলুম করে। কেননা সে জানে না যে, তালাকের পরেও আল্লাহ কোন (সমঝোতার) পথ বের করে দিতে পারেন’ (তালাক্ব ৬৫/১)।

শরীয়তের বিধান অনুযায়ী স্ত্রীর প্রথম পিরিয়ডে/মাসিকের পর পবিত্র অবস্থায় এক তালাক, দ্বিতীয় পিরিয়ডের পর দ্বিতীয় তালাক এবং তৃতীয় পিরিয়ড শেষ হয়ে যাওয়ার পর অর্থাৎ মাঝে দুটি পিরিয়ড এবং শুরু ও শেষে এক মাস, এক মাস করে হিসাব করে স্ত্রী স্বামীর বাসা থেকে বিদায় নেবে। শরীয়তে ৯০ দিনের চেয়ে তিনটি নির্ভেজাল পিরিয়ডের দিকে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। অর্থাৎ শরীয়তের বিধান মোতাবেক তিনটি পিরিয়ড বা মাসিক সহবাস ছাড়া অতিক্রান্ত হলে ইদ্দতকাল পূর্ণ হবে। কিন্তু বাংলাদেশের আইনে পিরিয়ড না হিসেব করে তালাক ঘোষণার পর চেয়ারম্যান বরাবর নোটিশ প্রেরণের তারিখ নয়, বরঞ্চ চেয়ারম্যান নোটিশ হাতে পাওয়ার তারিখ থেকে ৯০ দিন অতিক্রান্ত হলেই ইদ্দতকাল পূর্ণ হবে এবং তালাক কার্যকর হবে। ইদ্দতকাল নিয়ে শরীয়ত এবং বাংলদেশের আইনের মধ্যে এটিই হলো পার্থক্য। 

৪. তালাকের নোটিশ প্রেরণ:


স্বামী স্ত্রীকে তালাক দেয়ার পর পরই চেয়ারম্যানকে তালাকের নোটিশ প্রেরণের কথা আইনে বলা হয়েছে। যা প্রেরণ না করলে আইনে শাস্তির ব্যবস্থা আছে। যার শাস্তি হলো ১ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয়ই। তালাক দেয়ার পর কতক্ষণের মধ্যে চেয়ারম্যানকে এই নোটিশ দিতে হবে তা উল্লেখ নেই তবে তালাক দেয়ার পর পরই বলা আছে। এবং উক্ত নোটিশের একটি অনুলিপি স্ত্রীর হাতে দিতে হবে। কাজী অফিসে তালাকের কোন নোটিশ পাঠাতে হবে না। তালাকের নোটিশের কোন ফরম্যাট নাই। এই নোটিশে কোন স্ট্যাম্পও যুক্ত করতে হবে না। শুধু সাদা কাগজে স্বামী স্ত্রীর নাম ঠিকানা লিখে, আমি অমুক, এই ঠিকানা, অমুক কে তালাক দিলাম। কোন যৌক্তিক কারণ উল্লেখ করলেও চলে, না করলেও অসুবিধা নাই। কারণ বাংলদেশের আইনে কোন কারণ ছাড়াই স্বামী যেকোন সময় তার স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে। স্ত্রী যদি স্বামীর ঘরে না থেকে বাবার বাড়িতে অবস্থান করে তাহলে সে ঠিকানা বরাবর নোটিশের অনুলিপি পাঠাতে হবে। স্ত্রীর হাতে সরাসরি, ডাকযোগে বা কুরিয়ারে রেজিস্টার্ড করে পাঠানো যাবে। স্বামীর না স্ত্রীর কোন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বরাবর নোটিশ দিতে হবে সেটি আইনে স্পষ্ট উল্লেখ নেই। সুতরাং যেকোন একজনের ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বরাবর নোটিশ পাঠানো যাবে। পৌরসভা হলে পৌরসভার চেয়ারম্যান বা মেয়রের কাছে, সিটি করপোরেশন হলে মেয়র বা প্রশাসক বরাবর নোটিশ পাঠাতে হবে। বাংলাদেশের আইনে ৯০ দিন গণনা করা হবে যেদিন চেয়ারম্যান তালাকের নোটিশ হাতে পাবেন সেদিন থেকে। চেয়ারম্যান কারো কাছ থেকে তালাকের নোটিশ হাতে পাওয়ার পর দুপক্ষকে নোটিশ দিয়ে তাদের একজন করে প্রতিনিধি দিতে বলবেন। কোন একটি পক্ষ প্রতিনিধি না দিলেও সমস্যা নেই। উক্ত দুই প্রতিনিধি আর চেয়ারম্যান সহ মিলে সালিশ কমিটি করে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে পুনর্মিলন বা সমঝোতার জন্য চেষ্টা করবেন। উক্ত চেষ্টা ব্যর্থ হলে ৯০ দিন পূর্ণ হওয়ার পর তালাক কার্যকর হবে। অর্থাৎ চেয়ারম্যানের নিকট নোটিশ হাতে আসার পর ৯০ দিন সময় টি গণনা হবে এবং সালিশ কমিটির সমঝোতা চেষ্টাও যুগপৎ চলতে থাকবে। উক্ত ৯০ দিনের মধ্যে সমঝোতা চেষ্টা ব্যর্থ হলে তালাকটি ৯০ দিন অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে কার্যকর হবে। 
চেয়ারম্যান যদি মুসলিম না হয়ে অন্য ধর্মের হয় কিংবা চেয়ারম্যানের অসুস্থতা বা অন্য কোন কারণে অক্ষম হলে ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার বা পৌরসভা হলে কমিশনার থেকে একজনকে সালিশ কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচন করে নিতে হবে।
উক্ত সালিশ বিষয়ে বলা হয়েছে 'মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১' এর ২ ধারার ব্যাখ্যায়। বলা হয়েছে-

"আরবিট্রেশন কাউন্সিল" অর্থ এই অধ্যাদেশের কার্য সম্পাদন করতে চেয়ারম্যান এবং প্রত্যেক পক্ষের প্রতিনিধি সমন্বয়ে গঠিত একটি সংস্থা।
তবে শর্ত থাকে যে যেখানে কোনও পক্ষ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিনিধি মনোনীত করতে ব্যর্থ হন, সেখানে উক্ত প্রতিনিধি ব্যতীত গঠিত সংস্থা সালিশ পরিষদ হইবে।

৫. হিল্লা বিয়ে সম্পর্কে বাংলাদেশের আইন কি বলে: 


এরকম একটি তালাক কার্যকর হওয়ার পর স্বামী স্ত্রী পুনরায় সংসার করতে চাইলে নতুন করে বিয়ে পড়িয়ে সংসার করতে পারবে কোন ধরণের তৃতীয় বিয়ে বা হিল্লা বিয়ের প্রয়োজন নেই। ইসলামী শরীয়তের বিধানে একবার ইদ্দতকাল পূর্ণ হওয়ার পর পুনরায় বিয়ে করতে চাইলে হিল্লা বিয়ের কথা বলা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের আইনে এইভাবে তিনবার তালাক কার্যকর হয়ে যাওয়ার পর চতুর্থবারের মতো পুনরায় বিয়ে করতে চাইলে তখন হিল্লা বিয়ের অনুমতি রয়েছে। অর্থাৎ তিন তিন বার তালাকের ঘোষণা এবং তিন বার ইদ্দত কাল অতিবাহিত হয়ে গেলে চতুর্থবার বিয়ের সময় হিল্লা বিয়ের কথা বলা হয়েছে বাংলাদেশের আইনে। অর্থাৎ কেউ একজন তার স্ত্রীকে তালাক দিল এবং নিয়ম মোতাবেক সবকিছু মেনে ৯০ দিন অতিবাহিত হলো এবং তারা আবার বিয়ে করলো। দ্বিতীয়বার স্বামী আবার তালাক দিল এবং ইদ্দতকাল বা ৯০ দিন পূর্ণ করলো এবং আবার বিয়ে করলো। তৃতীয়বার আবার তালাক দিল এবং ইদ্দতকাল পূর্ণ করল। এবার বিয়ে করতে চাইলে স্ত্রীকে হিল্লা বিয়ে দেয়ার অনুমতি আছে। ইসলামী শরীয়তের বিধান আর বাংলাদেশের আইনে হিল্লা বিয়ে নিয়ে এটুকুই পার্থক্য। শরীয়তের বিধানে একবার তালাক ও ইদ্দতকাল পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর পুনরায় বিয়ে করতে চাইলে হিল্লা বিয়ে দিতে হবে অর্থাৎ স্ত্রীকে তৃতীয় কোন ব্যক্তির সাথে বিয়ে দিতে হবে এবং সে তালাক দিবে তারপর আগের স্বামী তাকে বিয়ে করতে পারবে। কিন্তু বাংলাদেশের আইনে তিন তিনবার তালাক কার্যকর হওয়ার আগে হিল্লা বিয়েকে নিষিদ্ধ করেছে। হিল্লা বিয়ের সমস্যা হলো তৃতীয় যে ব্যক্তি বিয়ে করবে সে যদি তালাক না দেয় তাহলে আগের স্বামী আর বিয়ে করতে পারবেনা। এজন্য পাগল ছাগল টাইপ কাউকে ধরে উক্ত স্ত্রীকে বিয়ে দিয়ে আবার তাকে দিয়ে তালাক দিয়ে স্ত্রীকে আগের স্বামীর জন্য বিয়ের জন্য হালাল করা হয়। এই ধরণের বিধান কোন হাদীস কিংবা কুরআনে আছে কিনা আমার জানা নাই। 

দেনমোহর স্ত্রীকে তালাক দেয়ার আগে দিব না পরে দিব এই নিয়ে অনেকে দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকেন। আসলে বাকি বা অপরিশোধিত দেনমোহর স্ত্রী চাহিবামাত্র পরিশোধ যোগ্য। দেনমোহর বিয়ের আগে দেয়ার শরীয়তে বিধান আছে। আইনেও স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধের জন্য জোরালোভাবে বলা আছে। এজন্য তালাকের পর স্ত্রী দেনমোহর ও ভরণপোষণের জন্য মামলা করে থাকে। 
তালাক দেয়ার সময় স্ত্রী যদি গর্ভবতী থাকে বা কনসিভ করা অবস্থায় থাকে তাহলে সে শিশুটি জন্মগ্রহণ করা পর্যন্ত ইদ্দতকাল চলবে তবে তালাক ঘোষণার পরবর্তী ৯০ দিনের আগেই নবজাতক জন্মগ্রহণ করে তাহলে ৯০ দিন পর্যন্ত ইদ্দতকাল পূর্ন করতে হবে। 

নিচে 'মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১' এর তালাক সম্পর্কিত ৭ ধারাটির বঙ্গানুবাদ তুলে ধরা হলো: 

তালাক ৭। (১) কোন ব্যক্তি স্ত্রীকে তালাক দিতে ইচ্ছুক, যে কোনও রূপে তালাকের ঘোষণার পরপরই চেয়ারম্যানকে তার লিখিতভাবে নোটিশ প্রদান করবেন এবং তার অনুলিপি স্ত্রীর কাছে সরবরাহ করবেন।
(২) যে কেউ উপ-ধারা (১) এর বিধান লঙ্ঘন করে তাকে এক বছরের কারাদণ্ড বা জরিমানা, যা দশ হাজার টাকা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে। 
(৩) উপ-ধারা (৫) এ প্রদত্ত পরিস্তিতি ছাড়া, তালাক যদি পূর্বে প্রত্যক্ষভাবে বা অন্যথায় প্রত্যাহার না করা হয় তবে উপ-ধারা (১) এর অধীন নোটিশ প্রদানের দিন থেকে নব্বই দিনের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর হবে না।
(৪) উপ-ধারা (১) এর অধীনে নোটিশ প্রাপ্তির ত্রিশ দিনের মধ্যে চেয়ারম্যান স্বামী-স্ত্রী দু পক্ষের মধ্যে পুনর্মিলন করার উদ্দেশ্যে সালিশী কাউন্সিল গঠন করবেন এবং সালিসী পরিষদ প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করিবেন। 
(৫) তালাক উচ্চারণের সময় স্ত্রী যদি গর্ভবতী হন তবে উপ-ধারা (৩) এ উল্লিখিত সময়কালের বা গর্ভধারণ, যে কোনটা পরে সংঘটিত হবে সেটা শেষ না হওয়া অবধি তালাক কার্যকর হবে না।
(৬) এই ধারা অনুযায়ী কোন তালাক কার্যকর হয়ে যাওয়ার পরে অন্য কোন তৃতীয় ব্যক্তির সাথে বিবাহ বন্ধন ছাড়া স্ত্রী একই স্বামীকে পুনরায় বিয়ে করতে কোন কিছুই বাঁধা হয়ে দাঁড়াবেনা যদি না তৃতীয়বারের মতো এই তালাক কার্যকর হয়।

উক্ত আইনে চেয়ারম্যান বলতে যা বুঝানো হয়েছে তার বঙ্গানুবাদ ও নীচে দেয়া হলো:

(খ) "চেয়ারম্যান" অর্থ-
(i) ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান;
(ii) পৌরসভার চেয়ারম্যান;
(iii) পৌর কর্পোরেশনের মেয়র বা প্রশাসক;
(iv) সেনানিবাস অঞ্চলে সরকার কর্তৃক এই অধ্যাদেশের অধীনে চেয়ারম্যানের কার্য সম্পাদনের জন্য নিযুক্ত ব্যক্তি;
(v) যেখানে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা পৌর কর্পোরেশনকে বরখাস্ত করা হয়, এই পরিষদ, পৌরসভা বা কর্পোরেশনের কার্যাদি নিরূপণকারী ব্যক্তি বা সরকার এই অধ্যাদেশের অধীন চেয়ারম্যানের কার্যাদি সম্পন্ন করতে নিযুক্ত হন। 
ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার চেয়ারম্যান বা পৌর কর্পোরেশনের মেয়র যেখানে একজন অমুসলিম, বা তিনি নিজে সালিস কাউন্সিলের কাছে আবেদন করতে ইচ্ছুক, বা অসুস্থতার কারণে বা অন্য কোনও কারণে অক্ষম। সেক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা পৌর কর্পোরেশনের চেয়ারম্যানের কার্য সম্পাদন করতে এই অধ্যাদেশের উদ্দেশ্যে তার একজন মুসলিম সদস্য বা কমিশনারকে চেয়ারম্যান হিসাবে নির্বাচিত করবে।

লেখক: শহিদ রাসেল
আইনজীবী, চট্টগ্রাম জজ কোর্ট 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

5 মন্তব্যসমূহ

  1. বেশ ভালো লেগেছে। বাট ইসলামী আইন বিরোধী হওয়াতে কিছু কথা আমার প্রাণবন্ত হয়নি। তেমনি ভাষার অসুন্দর্যতা ও রয়েছে অনেক।

    উত্তরমুছুন
  2. ইসলামে হিল্লা বিয়ে বা চুক্তির বিয়ে হারাম

    উত্তরমুছুন
  3. ধন্যবাদ স্যার স্যার আমার স্ত্রী প্রেগন্যান্ট ২ মাস তবে এখন তালাক দিতে চাইলে কি করতে হবে এবং কতদিন পরে কার্যকর হবে। বাচ্চা জন্মের পড় হতে কি ইদ্দতকাল ৯০ হবে না এখন থেকেই হবে।

    উত্তরমুছুন
  4. Kaji office giye akta somossar karone amra dujone dujonke talak dei, akon amra aksat hote chai tahole ki abar biye kora lagbe

    উত্তরমুছুন
  5. হিল্লা বিয়ে বলে শরীয়তে কিছুই নেই, প্রচলিত সমাজ হিল্লা বিয়ে বলতে যা বুঝে সেই ধরণের কোনো বিয়ের কথা শরীয়তে নেই। তালাকের পর স্ত্রীর স্বাভাবিকভাবে যদি অন্য কোথাও বিবাহ হয় এবং স্বাভাবিকভাবে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়, তাহলে ইদ্দত পালন শেষে উভয়পক্ষ (১ম স্বামী ও স্ত্রী) সহমত থাকলে পুনরায় প্রথম স্বামীকে বিবাহ করতে পারবে। তবে আমাদের সমাজ হিল্লা বিয়ে বলতে অন্য কিছু বুঝে।

    উত্তরমুছুন

If you have any question, please let me know.