অনলাইনে পণ্য কিনে প্রতারিত হলে করণীয় কী? BDLAW ASK

অনলাইনে পণ্য কিনে প্রতারিত হলে করণীয় কী?




দিন দিন অনলাইনে কেনাকাটা যেমন বাড়ছে তেমনি বাড়ছে এর জনপ্রিয়তা। ঘরে বসে পছন্দের পণ্য অর্ডার করে ঘরেই পৌছিয়ে দিলে আরতো কথাই নেই। মানুষের ঘেঁষাঘেঁষি, ঠেলাঠেলি থেকেও বাঁচা গেল। কিন্তু যে কথা সে মত কাজ নাহলে কার ভালো লাগে? অর্ডারকৃত পণ্য নাদিয়ে অন্য পণ্য দেয়া, বলেছিলেন কালো-দিল সাদা, ডেলিভারি ডেট এ না দিয়ে  বিলম্ব করা যেসময় হয়তো পণ্যটির আপনার প্রয়োজনই নাই। অথবা ক্রেতার ওয়েবসাইট বা পেইজ হঠাৎ উধাও। অথবা অন্য যেকোন ধরনের প্রতারণা সংঘটিত হতে পারে অনলাইন কেনাকাটায়। 


আইনি প্রতিকার

দু ধরণের প্রতিকার আইনে আছে। আপনি চাইলে অপরাধীকে শাস্তির আওতায় আনতে পারেন। শাস্তি হিসেবে জেল ও জরিমানা করা হয়। আর এ ধরণের আইনি প্রতিকারকে আইনের ভাষায় ফৌজদারি প্রতিকার বলে।

আর আপনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে, আর্থিক ক্ষতিপূরণ চাইতে পারেন। [ভো:অ:স:আ: ধারা ৬৬(১)] এধরনের প্রতিকারকে আইনের ভাষায় দেওয়ানি প্রতিকার বলে।

অনলাইনে পণ্য কিনে প্রতারিত হলে আপনি ফৌজদারি এবং দেওয়ানি উভয় ধরণের প্রতিকার পেতে পারেন। [ভো:অ:স:আ: ধারা:০৩]


ফৌজদারি প্রতিকার চাওয়ার পদ্ধতি:

আগেই বলেছি ফৌজদারি প্রতিকার বলতে শাস্তি হিসেবে জেল এবং জরিমানাকে বুঝায়। এজন্য দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় প্রতারণার মামলা করতে পারেন। অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদন্ড এবং জরিমানা হতে পারে। প্রচলিত ফৌজদারি আদালতে এ মামলা দায়ের করতে হয়। 

সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হচ্ছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে প্রতিকার চাওয়া। ভোক্তাদের স্বাস্থ্য,  স্বার্থ, খাদ্য নিরাপত্তা ও অধিকার ইত্যাদি সুচারুভাবে দেখভালের জন্য ২০০৯ সালে এ আইনটি প্রণয়ন করা হয়। এটিও একধরণের ফৌজদারি প্রতিকার অর্থাৎ ভোক্তার অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তকে শাস্তি হিসেবে জেল-জরিমানা করা হয়। 

প্রচলিত ফৌজদারি আইনে দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় প্রতারনার মামলা অথবা ভোক্তা অধিকার আইনে মামলা যেকোন একটি মামলা করা যাবে। অর্থাৎ ফৌজদারি প্রতিকার হিসেবে প্রচলিত আইনে ফৌজদারি মামলা করে অপরাধীকে জেল জরিমানা করে আবার ভোক্তা অধিকার আইনেও অভিযুক্তকে শাস্তি দেয়া যাবে না। [ভো:অ:স:আ: ধারা:৬৪] ফৌজদারি প্রতিকার হিসেবে দুটির যেকোন একটি নির্ধারণ করতে হবে। 

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে প্রতিকার চাইবেন কিভাবে: 

ভোক্তা অধিকার আইনে প্রতিকার চাওয়ার পদ্ধতি অতীব সহজ। এ আইনে অভিযোগও দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়। এ আইনে অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তকে শাস্তি হিসেবে বিভিন্ন মেয়াদে জেল-জরিমানা করা হয় আইন অনুসারে।যদি জরিমানা করা হয় জরিমানার ২৫% তৎক্ষণাৎ ক্ষতিগ্রস্ত ভোক্তাকে পরিশোধ করা হয়। কোন আইনজীবীর সাহায্য ছাড়াই ভুক্তভোগী এ আইনে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এর নিকট এ অভিযোগ দায়ের করতে পারে। তবে অভিযোগ অবশ্যই লিখিত হতে হবে। আরো সুবিধা হলো  সরাসরি অফিসে গিয়ে, কুরিয়ার অথবা ইমেইল তিনটির যেকোন একটি মাধ্যমে অভিযোগ পাঠানো যায়। সরাসরি বিভিন্ন বিভাগীয় ঠিকানায় অভিযোগপত্র জমা দেয়া যাবে। আর যেকোন জেলা থেকে কুরিয়ার করার ঠিকানা: জাতীয় ভোক্তা অভিযোগ কেন্দ্র,  টিসিবি ভবন- ৯ম তলা, ১ কারওয়ান বাজার ঢাকা, ফোন: ০১৭৭৭ ৭৫৩৬৬৮  এবং ইমেইল করার ঠিকানা: nccc@dncrp.gov.bd 

অভিযোগ দায়ের করার সময় অধিদপ্তরের নির্দিষ্ট ফরমে অভিযোগ দাখিল করতে হবে। অভিযোগ ফরমটি অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট থেকে ডাউনলোড করে তা পূরণ করে স্ক্যান করে ইমেইল অথবা পূরণকৃত ফরম কুরিয়ার অথবা সরাসরি অফিসে জমা দেয়া যাবে। অভিযোগ ফরম ডাউনলোড লিংক: Download

অভিযোগ পত্র পূরণ করার সময় ফর্মের চাহিত পর্যাপ্ত তথ্য দিতে হবে। বিশেষ করে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত উভয় পক্ষের পূর্ণাঙ্গ নাম ঠিকানা, প্রতারনার তারিখ এবং কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেন তার বর্ণনা  সঠিকভাবে দিতে হবে। প্রমাণ হিসেবে অভিযোগ পত্রের সাথে অবশ্যই পণ্য/মূল্যের মানি রশিদ সংযুক্ত করতে হবে।

অভিযোগ পাওয়ার পর আবেদনকারীর দেয়া ঠিকানা বরাবর অভিযুক্তকে নোটিশ দিয়ে নির্দিষ্ট দিনে হাজির হতে বলা হয়। উভয়পক্ষের বক্তব্য শোনার পর অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তকে শাস্তি আরোপ করা হয় এবং যদি জরিমানা করা হয় আদায়কৃত জরিমানার ২৫% অভিযোগকারীকে তৎক্ষণাৎ প্রদান করা হয়। 

অভিযোগ দেয়ার সময় আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সময়। অর্থাৎ অভিযোগ করার কারণ উদ্ভূত হওয়ার দিন থেকে ৩০ দিনের মধ্যে অভিযোগ দাখিল করতে হবে। অনলাইনে পণ্য কিনলে ডেলিভারির জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এক্ষেত্রে ডেলিভারি ডেট জানা জরুরি। ডেলিভারি ডেট নির্ধারিত না থাকলে অভিযোগ দায়ের করার সময়সীমা গণনা কিংবা প্রমাণ করা জটিল হয়ে যায়। এজন্য ডেলিভারি ডেট নির্ধারিত থাকলে সে ডেট অনুযায়ী ডেলিভারি করা না হলে ডেলিভারি ডেট এক্সপাইয়ার্ড হওয়ার পরদিন থেকে ৩০ দিনের মধ্যে অভিযোগ দায়ের করতে হবে। [ভো:অ:স:আ: ধারা:৬০] অন্যথা অভিযোগ নাকচ করে দেয়া হবে। 

অনলাইনে পণ্য কিনে ভোক্তা অধিকার আইনে প্রতিকার পেতে পূর্ব থেকে যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে: 

অনলাইনে লেনদেন করার সময় কিছু বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করলে ভোক্তা আইনে প্রতিকার পাওয়া খুব সহজ। টাকা পরিশোধের মানি রিসিপ্ট খুবই জরুরী। অনলাইনে পণ্য অর্ডার করার পর পেমেন্ট করার সময় পেইড সাক্সেসফুলি অথবা পেইড লেখা সম্বলিত পেইজটির স্ক্রিনশট, বিকাশে পেমেন্ট করলে বিকাশ মেসেজের স্ক্রিনশট, পণ্যের ডিস্ক্রিপশন সম্বলিত পেইজের স্ক্রিনশট, যে নম্বরে বিকাশ করলেন সে নম্বর, পণ্য অর্ডার করার পর অর্ডারড লেখা পেইজটি তারিখ সহ স্ক্রিনশট নিয়ে রাখতে হবে। যার থেকে কিনছেন তিনি কোন ব্যক্তি বা পেইজ হলে তার ট্রেড লাইসেন্স আছে কিনা থাকলে লাইসেন্সের নম্বর জেনে নিবেন এবং সে ব্যক্তির নাম ঠিকানা সঠিকভাবে জানতে হবে। কোন ফেসবুক পেইজ হলে পেইজটির সত্ত্বাধিকারীর নাম ঠিকানা অবশ্যই জেনে নিবারণ এবং সংগ্রহে রাখবেন। কারণ যার বিরুদ্ধে অভিযোগ করবেন তার ঠিকানা না থাকলে অভিযুক্তকে খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে যায়। কোন  ইকমার্স সাইট হলে যে স্টল থেকে পণ্য কিনবেন সে স্টলের পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা জানা দরকার। 

মনে রাখবেন, যারা অনলাইনে প্রতারণা করেন তারা নাম ঠিকানা গোপন করে এ কাজটি করেন। ভুয়া আইডি অথবা ফেসবুক পেইজ থেকে প্রকৃত নাম ঠিকানা জানা যায়না। তাই কোন ফেসবুক আইডি বা পেইজ থেকে পণ্য কেনার সময় বিশেষ ভাবে পরিচিত না হলে প্রতারণা হওয়ার সম্ভাবনা ই বেশি। ই কমার্স সাইট হলে উক্ত সাইটের সিইও, যে স্টল থেকে অর্ডার করেছিলেন সে স্টলের না ঠিকানা জানা দরকার। অভিযোগ করার কারণ উদ্ভূত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে অভিযোগ দাখিল করতে হবে।

এসব বিষয়াদি খেয়াল রাখলে প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে এবং ভোক্তা আইনে প্রতিকার পাওয়া ও সহজ। 

মিথ্যা অভিযোগের শাস্তি: 

এ আইনে মিথ্যা অভিযোগকারীর বিরুদ্ধেও শাস্তির ব্যবস্থা আছে। কাউকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে অভিযোগ করা হয়েছে প্রমাণিত হলে অভিযোগ কারীকে অনূর্ধ তিন বছর জেল বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করতে পারে। [ভো:অ:স:আ: ধারা:৫৪]

দেওয়ানি প্রতিকার চাওয়ার পদ্ধতি:

প্রচলিত দেওয়ানি আদালতে ক্ষতিপূরণের মামলা করতে হবে। এজন্য একজন আইনজীবীর সাহায্য প্রয়োজন হবে।

©লেখাটি লেখক কতৃক সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত


লেখক: শহিদ রাসেল
আইনজীবী, চট্টগ্রাম জজ কোর্ট

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ

  1. আমি অনলাইন পন্ন কিনে পন্ন পাই নাই টাকা পঠিয়েছও কিন্ত পন্ন পাই নি পোন দিলে বন্ধ পাই এখন কি করব

    উত্তরমুছুন

If you have any question, please let me know.