ডাঃ সাবরিনাকে পুলিশ হাতকড়া পরালোনা কেন? আর হাতকড়া নিয়ে আইন কি বলছে? BDLAW ASK

ডাঃ সাবরিনাকে পুলিশ হাতকড়া পরালোনা কেন? আর হাতকড়া নিয়ে আইন কি বলছে?


পুলিশ কতৃক হাতকড়া পরানো নিয়ে মানুষের ক্ষোভ যেমন তেমনি পুলিশের  বৈষম্যমূলক আচরণ ও পরিলক্ষিত হয়। যেমনঃ একজন সাংবাদিক, বৃদ্ধ, শিশু অথবা নারীকে হাতকড়া পরানো মানুষ স্বাভাবিক ভাবে ঘৃণা করবে।

সম্প্রতি করোনার ভুয়া রিপোর্ট দেয়ার অভিযোগে জেকেজির কথিত চেয়ারম্যান হওয়ায় গ্রেপ্তার করা হয় ডাঃ সাবরিনা কে। গ্রেপ্তারের পর তার হাত খোলা অবস্থায় হেটে যেতে ভিডিও ও ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয়। সাধারণ মানুষের চোখে এহেন ঘৃণ্য অপরাধে অভিযুক্ত হয়েও কেন হাতকড়া পরানো হলো না তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকেই। অথচ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিক শহিদুল ইসলামকে হাত কড়া পরিয়ে গ্রেপ্তারের ছবি, কয়েক মাস আগে আরেক সাংবাদিককে পিছমোড়া করে গ্রেপ্তারের ছবি, চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য অধিগ্রহণ কৃত জমির ন্যায্য মূল্যের দাবিতে আন্দোলনরত মানুষের উপর হামলার পর আহত লোকদের হাতকড়া পরানোর ছবি ও খবর সংবাদ মাধ্যমে আসে। এমন ও দেখা গেছে শিশুদের হাত কড়া পরিয়ে কিংবা অসুস্থ ব্যক্তিদের হাতকড়া পরা অবস্থায় চিকিৎসা দিতে।

এজন্য কৌতূহল হলাম আইনে হাতকড়া পরানোর বিধান কোথায় আছে। অনেক ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তার এ ব্যাপারে ধারণা নেই এবং একেকরকম মতামত দিতে দেখা যায়। এখানে বলে রাখি, পুলিশি ব্যবস্থা ও বিধানগুলি বৃটিশের আদলে গড়ে উঠেছে এবং সেগুলোর তেমন পরিবর্তন সাধন হয়নি।

আইন অনুসন্ধান করে দেখা যায়, হাতকড়া পরানোর ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট  দিকনির্দেশনার ব্যাপক ঘাটতি থেকে গেছে। বৃটিশ অনাচার যেমন ছিল এখনো তাই আছে। এরপর ও তাদের আইনে একটু হলেও সভ্যতার ছোঁয়া আছে যা বর্তমান পুলিশের আচরণে নাই। আমরা আমাদের দ্বারা শোষিত হওয়ায় বৈষম্য বেশি। কিন্তু ব্রিটিশ আগন্তুক কতৃক শোষিত হলেও শোষণের শিকার হয়েছিলাম বটে তবে বর্তমান বৈষম্যের শিকার হয়নি।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন, আইন ব্যক্তিত্ব গণ, প্রখ্যাত আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী সবাই হাতকড়া বা ডান্ডাবেরি পরানোর সমালোচনা করেছেন। 

ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এর ধারা ৪৬ (১) বলা হয়েছে: 
পুলিশ যাকে গ্রেপ্তার করবেন তাকে স্পর্শ করবেন অথবা তাকে আবদ্ধ করবেন গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে। ৪৬(২) এ বলা হয়েছে: যদি গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি বলপ্রয়োগ করেন বা পালানোর চেষ্টা করেন তাহলে পুলিশ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে পারবেন। ৪৬(৩) ধারায় বলা হয়েছে যে তবে পুলিশ আসামির পালানো রোধ করতে গিয়ে আসামির মৃত্যু ঘটাতে পারবেনা যদি সে মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে জাতীয় অপরাধের ধারায় অভিযুক্ত না হয়। 

আইনে হাত কড়া পরানোর ব্যাপারে উল্লেখ আছে বেঙ্গল পুলিশ প্রবিধানে বা পিআরবি এর ৩৩০ ধারা। এ ধারায় বলা হয়েছে: 


Section 330:
(a) Prisoners arrested by the police for transmission to a Magistrate or to the scene of an 
enquiry, and also under-trial prisoners, shall not be subjected to more restrain than is necessary 
to prevent their escape. 
The use of handcuffs or ropes is often an unnecessary indignity In no case, shall women be handcuffed; nor shall restrain be used to those who either by age or 

infirmity are easily and securely kept in custody. Witnesses arrested under section 171, Code of 

Criminal Procedure, shall, in no circumstances be handcuffed.

In hailable cases prisoners should not be handcuffed unless violent and7 then only by the order 

of the officer in charge of the police-station, the reason for the necessity of this action being  
entered in the general diary and in the certificates in B. P. Form No. 57.

In non-bailable cases, the amount of restrain necessary must be left to the discretion- of the

officers concerned, in certain circumstances the use of handcuffs may not be necessary to 

prevent escape but, if for instance, the prisoner is a powerful man in custody for a crime of 

violence, or is of notorious antecedents, or disposed to give trouble, or if the journey is long, or 

the number of prisoners is large, handcuffs way properly be used escort should, in any case, be 

supplied with handcuffs for use, should necessity arise.

(b) In the case of two prisoners whom it is necessary to handcuff, they will be handcuffed in 

couples, the right wrist of one to the left wrist of the other. In no circumstances should more than two prisoners be secured together.

(c) In all cases in which the use of handcuffs is allowed and considered necessary, and when 

no proper handcuffs are available, the prisoners may be secured by ropes or pieces of clothing. 

These shall be so tied, as not to interfere unduly with proper circulation, and shall be replaced 

by handcuffs as soon as possible.

(d) Great caution shall be exercised at all times in the removal of handcuffs and other 

fastenings from prisoners en route whether by land or water.

(e) Handcuffs shall be- kept in good order. If broken, they shall be mended or replaced 

without delay.


ধারা ৩৩০: 
(ক) ম্যাজিস্ট্রেট বা কারাগারে  স্থানান্তরিত করার জন্য পুলিশ কর্তৃক গ্রেপ্তারকৃতরা তদন্ত, এবং বিচারের অধীনে থাকা বন্দীদেরও প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন না তাদের পলায়ন রোধ করতে। হাতকড়া বা দড়ি ব্যবহার প্রায়শই একটি অপ্রয়োজনীয় এবং ক্রোধ মূলক কাজ। কোনও অবস্থাতেই, মহিলাদেরকে হাতকড়া দেওয়া হবে না; বা যারা বয়সের দ্বারা বা অক্ষমতা, অসুস্থতা জনিত কারণে সহজে এবং নিরাপদে হেফাজতে রাখা হয়। এছাড়া
ফৌজদারী কার্যবিধি, ১৭১ ধারায় গ্রেপ্তারকৃত সাক্ষীকে কোনও অবস্থাতেই হাতকড়া দেওয়া হবে না।

আপত্তিজনক মামলার ক্ষেত্রে, বন্দীদের হাতকড়া পরানো উচিত নয় যদি না সে আক্রমণাত্মক নাহয়। এবং থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার এর আদেশ অথবা এই পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কারণ বি। পি। ফর্ম নং 57 এ সাধারণ ডায়েরি করার কারণ থাকে। 

অ-জামিনযোগ্য ক্ষেত্রে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার পরিমাণ  বিবেচনায় রেখে হাত কড়া পরাতে হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে হাতকড়া ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে না বলে মনে করলেও হাত কড়া পড়াতে হবে না। 

পালানোর সম্ভাবনা আছে উদাহরণস্বরূপ, বন্দী কোনও অপরাধের জন্য হেফাজতে থাকাকালে একজন শক্তিশালী মানুষ, সহিংসতা বা কুখ্যাত পূর্বসূরি বা যদি যাত্রা দীর্ঘ হয়, বা বন্দীদের সংখ্যা বড়, হাতকড়া পরাতে হয় যা যথাযথভাবে ব্যবহার করা উচিত শুধু পালানো রোধ করতে। 
(খ) দু'জন বন্দীর ক্ষেত্রে যাদের হাতকড়া দরকার, তাদের হাতকড়া দেওয়া হবে যেন অন্যের বাম হাতের কব্জির সাথে  ডান হাতের  কব্জি। কোনও পরিস্থিতিতে এর চেয়ে বেশি হওয়া উচিত নয় দুজন বন্দী যেন একসাথে সুরক্ষিত থাকে।

(গ) যে সকল ক্ষেত্রে হাতকড়া ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় বিবেচিত হয়েছে এবং কখন কোন হাতকড়া পাওয়া যায়না সেক্ষেত্রে, বন্দীদের দড়ি বা পোশাকের টুকরো দ্বারা সুরক্ষিত করা যেতে পারে।

এগুলি যথাযথ রক্ত সঞ্চালন যেন করতে পারে এবং অযৌক্তিকভাবে হস্তক্ষেপ না করার জন্য এগুলি যথাযথ ভাবে এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হাতকড়া দিয়ে প্রতিস্থাপিত হবে। 

(ঘ) হাতকড়া ও অন্যান্য অপসারণে সর্বদা সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত যেমন জমি বা জলের পথে যাত্রী পথে বন্দীদের আনা নেয়ার ক্ষেত্রে। 

(ঙ) হাতকড়া ভালভাবে রাখা উচিত। যদি ভাঙা হয় তবে সেগুলি সংযোজন বা প্রতিস্থাপন করা হবে
অবিলম্বে।



শিশু আইন, ২০১৩  এর ধারা ৪৪(৩) তে শিশুদের হাতকড়া পরানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। 

শিশু আইন ধারা 44(3)

সুতরাং আইনের দিক নির্দেশনা হলো পালানো রোধ করতে যতটুকু ব্যবস্থা নেয়া উচিত ততটুকু ই নিতে হবে। হাতকড়া পরানো দরকার হলে পরাবে, দরকার না হলে পরাবেনা। একত্রে পুলিশের ক্ষমতা কাজ করছে। 

আর এদিক বিবেচনায় বৃদ্ধ, শিশু কিংবা নারীদের হাতকড়া পরানোর প্রয়োজন নেই বলে আইনে উল্লেখ আছে। 

এটাও উল্লেখ আছে যে দুর্ধর্ষ, উশৃঙ্খল  আসামী না হলে অথবা পালানোর সম্ভাবনা না থাকলে হাতকড়া পরানোর প্রয়োজন নেই বলে আইনে উল্লেখ আছে। 


© লেখক কতৃক লেখাটি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

লেখক: শহিদ রাসেল
আইনজীবী, চট্টগ্রাম জজ কোর্ট 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ